গত এক দশকে ধনী ব্যক্তিদের করব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাজ্য। বিদেশে স্থায়ী আবাস থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ করসুবিধা ‘নন-ডম’ ব্যবস্থা ২০২৪ সালের মার্চে বাতিল করা হয়। পাশাপাশি এ ব্যবস্থার আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের ওপর করের চাপও বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া গত দুই বছরে উত্তরাধিকার, পেনশন তহবিল, প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগের মুনাফা, নিয়োগকর্তার জাতীয় বিমা চাঁদা এবং মূলধনি মুনাফার ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ওপর উইন্ডফল ট্যাক্স আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি। ফলে ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের আশঙ্কা, সামনে করের বোঝা আরও বাড়তে পারে।
বিডিওর ব্যক্তিগত করবিষয়ক অংশীদার এলসা লিটলউড বলেন, অনেক গ্রাহকের ধারণা, যুক্তরাজ্যের করব্যবস্থায় এত বেশি পরিবর্তন এসেছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁরা এখন করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা চান।
যুক্তরাজ্য থেকে ঠিক কতজন ধনী ব্যক্তি চলে যাচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া কঠিন। ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব বিভাগ এইচএম রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ করবর্ষে নন-ডম করদাতার সংখ্যা ছিল ৭৩ হাজার ৪০০। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ৪০০ জন কমেছে।
তবে বেসরকারি ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ও কর পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস্তবে যুক্তরাজ্য ছাড়ার সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে।
অতিধনী ব্যক্তিদের অন্যতম বড় উদ্বেগ এখন যুক্তরাজ্যের উত্তরাধিকার কর। নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদের ওপর এ করের হার ৪০ শতাংশ। নতুন নিয়মে বিদেশে থাকা সম্পদও যুক্তরাজ্যের উত্তরাধিকার করের আওতায় এসেছে।
এক আন্তর্জাতিক প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানান, তাঁর পরিচিত অনেকেই যুক্তরাজ্য ছেড়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বক্তব্য, বিদেশি সম্পদের ওপর উত্তরাধিকার কর তুলে দেওয়া হলে তারা যুক্তরাজ্যে ফিরতে আগ্রহী হবেন।
ব্যবসায়িক সম্পদের ক্ষেত্রেও উত্তরাধিকার করের ছাড় কমানো হয়েছে। নতুন নিয়মে ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি মূল্যের ব্যবসায়িক সম্পদের ওপর ২০ শতাংশ হারে উত্তরাধিকার কর দিতে হবে। এতে পারিবারিক ব্যবসাগুলো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইনি প্রতিষ্ঠান উইদার্সের অংশীদার ক্রিস গ্রোভস বলেন, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে হঠাৎ তার মোট মূল্যের ২০ শতাংশ নগদ অর্থে কর হিসেবে পরিশোধ করতে হলে সেটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, করব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে উত্তরসূরিদের কর পরিশোধের অর্থ জোগাতে ব্যবসার অংশবিশেষ, এমনকি পুরো প্রতিষ্ঠানও বিক্রি করতে হতে পারে।
ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি বলেছেন, যুক্তরাজ্যকে ‘সম্পদ সৃষ্টির দেশ’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পুরোনো নন-ডম ব্যবস্থা বাতিলের পর নতুন করব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে যোগ্য নতুন করদাতারা প্রথম চার বছর বিদেশি আয় ও মুনাফার ওপর পুরো করছাড় পাবেন।
তবে কর পরামর্শকেরা এই সুবিধা চার বছরের পরিবর্তে ১০ বছর করার পরামর্শ দিয়েছেন। ইতালি ও গ্রিসের মতো নির্দিষ্ট হারে করব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও এসেছে। তাঁদের মতে, এতে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাজ্যে আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, দেশটির করব্যবস্থা আরও কঠোর হলে তিনি ব্যবসা জুরিখে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীও বলেছেন, যেসব দেশের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই কর সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকের ওপর নতুন কর আরোপ করা হলে দেশটির আর্থিক খাতে কর্মসংস্থান কমতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, গ্রিস, ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ যুক্তরাজ্যের এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। করসুবিধার পাশাপাশি এসব দেশের বড় শহরগুলোও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের বসবাসের জন্য ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।